স্বদেশ প্রেম রচনা – ক্লাস ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, এসএসসি, এইচএসসি

স্বদেশ প্রেম রচনা: আজকে তোমরা শিখবে স্বদেশ প্রেম রচনা যা ক্লাস ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। আমরা দুইটা নমুনা দিয়েছি, যেখানে ২০ ও ৩০ পয়েন্টে রচনাটি শিখতে পারবে। তাহলে আর দেরি কিসের, এখনি শেখা আরম্ভ করে দাও।

পোস্টের বিষয়বস্তুরচনা লিখন
রচনার টপিকস্বদেশ প্রেম
প্রযোজ্য শ্রেণিসমূহক্লাস ৫,৬, ৭, ৮,৯,১০, এসএসসি, এইচএসসি
নমুনা আছে২টি

স্বদেশ প্রেম রচনা ২০ পয়েন্ট

স্বদেশপ্রেম:

মিথ্যা মণি মুক্তা হেম
স্বদেশের প্রিয় প্রেম
তার চেয়ে রত্ন নাই আর।

– ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

নিজের দেশকে ভালোবাসে না এমন কেউ নেই। বনের পাখি সেও তার নীড়কে ভালোবেসে সারাদিনের কর্মকলাহলের পর খুঁড়ে-কুটো দ্বারা নির্মিত সামান্য বাসায় ফিরে আসে প্রশান্তির আশায়। মানুষও ভালোবাসে তার দেশকে। তার নিজের পরিচিত পরিবেশকে। যেখানে সে লালিত পালিত হয়েছে সেই স্থানটুকুকে। তাই সেই স্থানটির প্রতি প্রেম মঙ্গল ও উন্নতির জন্য সর্বকিছু সঠিক ও নিয়মানুবর্তীভাবে করতে মানুষকে উৎসাহিত করে। মানব চরিত্রের এই বিশেষ বৃত্তি বা গুণটির সঠিক চর্চা দেশ, জাতি তথা বিশ্বের জন্য কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে।

স্বদেশ প্রেম বা দেশপ্রেম কি : স্বদেশ বা নিজের দেশের প্রতি মানুষের অনুরাগ বা ভালোবাসার নামই স্বদেশপ্রেম। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ডঃ শহীদুল্লাহ বলেছেন- মাতা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি আমাদের কাছে সর্বোচ্চ মূলবান হয়ে ওঠে। মা, মাতৃভূমি, আর মাতৃভাষার প্রভাব প্রত্যেক মানুষের দেহ-মনে-প্রাণে বিদ্যমান। অতি স্নিগ্ধ ফুলধারার মত আমাদের জীবনের মধ্যস্থল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। স্বদেশের প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসা, অনুরাগ, মমত্ববোধকেই মূলত দেশপ্রেম বা স্বদেশপ্রেম বলে। দেশপ্রেম স্বদেশিক মানুষের জীবনের মূল্যবান সম্পদ।

স্বদেশপ্রেম কেন : নিজ দেশের প্রতি, ভাষার প্রতি, জাতির প্রতি, জাতীয়তাবাদের প্রতি সুদৃঢ় আকর্ষণ অনুভব করলেই দেশপ্রেমের জাগরণ ঘটে। দেশের প্রতি গভীর অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা ও যথার্থ আনুগত্যকেই দেশপ্রেম বলা চলে। সত্যিকার অর্থে মাতৃভূমির উন্নতিকল্পে সর্বস্ব ত্যাগের সাধনাই দেশপ্রেম। দেশপ্রেম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলে মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে গাইতে থাকে- “আমার এই দেশেতেই জন্ম যেন, এই দেশেতেই মরি।” দেশপ্রেম মানুষকে মূলত ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা থেকে রক্ষা করে তাকে ব্যাপক ও বৃহত্তরের মধ্যে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়। তাই কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে-

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়!
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে
কে পরিবে পায়!
কোটি কণ্ঠে থাক নরকের প্রায় হে
নরকের প্রায়!

– রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

দেশপ্রেমের উৎস : দেশপ্রেম যেমন মানুষের অস্তিত্ব তেমনি সহজাত প্রবৃত্তি। শুধু মানুষ নয় জীবমাত্রই এ প্রবৃত্তি ধারণ করে। তাই পশু জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে এসে যেমন ছুটাছুটি করে, পাখি আপন নীড়চ্যুত হলে মরিয়া চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি করে তোলে। এরূপই হয় নিজ আবাসের প্রতি ভালোবাসা এবং নিরাপদ একটি আশ্রয়ের কারণে। আর নিজ আবাসের প্রতি ভালোবাসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের আশাই যে কোন প্রাণী থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত নিজ বাসভূমির প্রতি প্রেমিক হয়ে ওঠে। এভাবেই জন্ম নেয় দেশপ্রেম।

স্বদেশপ্রেমের বিকাশ : মা, মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমি স্বদেশ প্রেম বিকাশের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একটি স্তর। এ পর্যায়সমূহ সফলতার সাথে অতিক্রমের মাধ্যমে একজন মানুষ তার স্বদেশ প্রেমের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে।

মা : দশ মাস গর্ভধারণ, তারপর জন্ম দেওয়া ও তীব্র কষ্টের বিনিময়ে লালন করে মা তার সন্তানকে। মায়ের সান্নিধ্যে থেকে নাড়ির বন্ধন যা কখনও ছিন্ন করা যায় না। আর সন্তানের প্রতি মায়ের গভীর ভালোবাসাই সন্তানকে ভালোবাসতে শেখায়। মায়ের প্রকৃত ভালোবাসার পাঠই মানুষকে দেশপ্রেমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

মাতৃভাষা : যে ভাষাতে প্রথম বলে ডাক মা-মা বলে- সে ভাষাই আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষাতেই আমাদের মনের আবেগ, অনুভূতি, আনন্দ-বেদনা প্রকাশ করে থাকি। অন্তরের ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষাকে ভালোবাসার মাধ্যমেই দেশপ্রেমের বিকাশ পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়।

মাতৃভূমি : মানুষ ধীরে ধীরে সন্তান হলেও সুনির্দিষ্টভাবে সে যে কোন একটি ভূ-খণ্ডে জন্মগ্রহণ করে। যে ভূ-খণ্ডে মানুষ জন্মগ্রহণ করে তার আলো-বাতাস, অন্ন-জলে বেড়ে ওঠে তাই তার জন্মভূমি তথা মাতৃভূমি। আর মাতৃভূমির ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশ, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রভৃতির সাথে পরিচিত হতে হতে জন্মভূমির এক চির আবদ্ধ, চির পবিত্র, চির উন্নত মাতৃময় ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে মানুষের হৃদয়ে। অতঃপর সেই তীব্র আবেগ স্বদেশ বন্দনায় বাণী হয়ে ঝরে পড়ে—

“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালবেসে।”

দেশপ্রেমের গুরুত্ব : দেশপ্রেম এমন একটি গুণ যা একজন মানুষকে নিঃস্বার্থ, স্বার্থত্যাগী, অনলস এবং দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রেরণা করে। এ প্রেম মানুষকে দায়িত্বশীল, উদ্যমী ও ত্যাগী আচরণ করতে শেখায়। প্রকৃত দেশপ্রেমিক শুধু দেশবাসীর দ্বারাই প্রশংসিত ও সম্মানিত হন না, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে শহীদের বা গাজীর মর্যাদা দেওয়া হয়। অর্থাৎ ইসলামে দেশপ্রেমকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়। দেশপ্রেমের মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মোৎসর্গকারী ব্যক্তিকে অমরত্ব দান করা হয়ে থাকে।

দেশপ্রেমের প্রকাশ : দেশের যে কোন বিপর্যয়ের মুহূর্তে দেশের প্রতি প্রেম প্রকাশ পেয়ে থাকে দেশের মানুষদের মধ্যে। যেমন: দেশের পরাধীনতায়, দেশের উপর বহিঃশক্তির হামলায়, স্বদেশের মুখে কলঙ্কজনক রক্তারির বিরুদ্ধে। এসব মুহূর্তে জনভূমি জননীর মতো তার সন্তানদের রক্ষার দিকে কাতর নয়নে তাকায় নিজেকে রক্ষা করার জন্য। অপরদিকে দেশমাতৃকার কষ্ট কষ্ট পেয়ে সন্তানও হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। তাই প্রমাণ পেয়েছি আমরা ‘৫২’, ‘৬৯’, ‘৭১’-এর আন্দোলনগুলোতে। এভাবেই দেশের মহান সন্তানরা দেশকে রক্ষা করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। অনেকেই যারা প্রবাস জীবন-যাপন করেছেন তাদেরও দেশমাতৃকার প্রতি প্রেমের অভাব নেই। কারণ পানির মাছ যেমন ছটফট করে তেমনি স্বদেশ ছেড়ে বিদেশেও তারা ছটফট করে। তাই কবির ভাষায় বলা যায়—

আমার কুটির খানি,
সে যে আমার হৃদয় রানী।

দেশপ্রেমের স্বরূপ :

জননী গো জন্মভূমি তোমারি পরন
দিতেছে জীবন মোরে নিশ্বাসে
নিশ্বাসে!
সুন্দর শ্যামলক্ষ্য, উজ্জ্বল তপন,
হেরেছি প্রথমে আমি তোমারি
আকাশে!

জনভূমি: গোবিন্দ চন্দ্র দাশ

দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুগে যুগে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মানুষ আত্মত্যাগের নজির রেখে গেছে। যেমন: ইংরেজ বেনিয়াদের তাড়াতে গিয়ে অকাতরে তিতুমীর দিয়েছে বুকের রক্ত হাসিমুখে। স্বদেশের গান গেয়ে ক্ষুদিরাম ঝুলেছে ফাঁসির দড়িতে। এছাড়া বায়ান্নতে ভাষা রক্ষার্থে দিয়েছে কত তাজা যুবক তাদের প্রাণ। ৭১-এ স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কত লক্ষ প্রাণ বিসর্জিত হয়েছে এবং পাশবিক তাণ্ডবে হেরে শেখ মুজিবকে কারাবরণ করতে হয়েছে। শুধু লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন তা নয়, ৩০ লক্ষ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েও শত্রুদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন নি। তাই তাদের স্মরণে কবির কণ্ঠে ধ্বনি—

“উদয়ের পথে ধ্বনি কার বাণী ভয় নাই ভয় নাই
নিশ্চয় প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”

দেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম : স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম পরস্পর গভীর সম্পর্কে সম্পর্কিত। স্বদেশপ্রেম বিশ্বপ্রেমেই অন্তর্নিহিত। স্বদেশপ্রেম যদি বিশ্বমানবতা ও আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্যের সহায়ক না হয় তবে তা প্রকৃত দেশপ্রেম হতে পারে না। দেশবাসীকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে মানুষ বিশ্ববাসীকে ভালোবাসতে শিখলেই প্রকৃত দেশপ্রেমী হওয়া যায়। তাই মহৎ ও জাগ্রত মনীষীরা কখনো মানুষে মানুষে, কালো-সাদায় কিংবা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে ভেদাভেদ সৃষ্টি করেন নি। তাই তাদের খ্যাতি বা সম্মান দেশ, কাল, বা জাতির গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের ছড়িয়ে পড়েছে। মূল স্বদেশপ্রেমই বিশ্বপ্রেম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন—

ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা,
তোমাতে বিশ্বময়ী, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।

দেশপ্রেম ও রাজনীতি : যার মধ্যে দেশপ্রেম নেই সে খাঁটি রাজনীতিক নয়। ক্ষমতার লোভ যাকে আঁকড়ে ধরেছে দেশপ্রেম তাকে ছেড়েছে। হিটলার, মুসোলিনির মত রাষ্ট্রনায়করা দেশপ্রেমিক নিশ্চয়ই নন; তাঁরা রাজনীতিবিদ মাত্র। দেশপ্রেমহীন রাজনীতির ফল শুধু ধ্বংস আর সর্বনাশ।

আইনস্টাইনের ভাষায়-

How long shall we tolerate the politicians hungry for power? – এই আদর্শে যে ক্ষেত্র ও বেদনা পুষ্ট সত্যের খাঁটিতে কোন বিবেকবান মানুষ কি তা সমর্থন না করে পারেন?

দেশপ্রেম ও সংস্কৃতি : ইংরেজি Culture বলতে আমরা বুঝি সংস্কৃতি। আচরণ-রুচির চর্চাপথে গড়ে ওঠা মানবিকতা যাতে প্রকাশ পায়, তাই আত্মিকতা আর পূর্ণতার সাধনা (perfection of life), এর পরিপূর্ণতার জন্য প্রয়োজন-

  • (i) Freedom of mind (স্বাধীনতা)
  • (ii) Universalism (বিশ্বমানবতা)
  • (iii) Urbanity (শালীনতা)

এ তিনটি সত্য যে জাতির মধ্যে পরিপুষ্ট সে জাতিই সভ্যতারোধে উন্নত। কিন্তু আজ বাংলার ক্ষেত্র লোকসংগীত, কুটির শিল্প, লোকসাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন বিজাতীয় ভাবধারায় পুষ্ট যে বাবু সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার সাথে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের যোগ সামান্যই। তাই বিশ্বের দরবারে দেশীয় সংস্কৃতির ভাবধারা তুলে ধরতে হবে এবং দেশীয় সংস্কৃতি নবধারায় নিজেকে সজ্জিত করে কবির ভাষায় বলতে হবে-

“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি।”

কবিতায় দেশপ্রেম : দেশপ্রেমী যেকোন কবির কবিতাতেই দেশপ্রেমের ছবি ফুটে উঠেছে যুগ যুগ ধরে। যেমন-

“আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন
মাটির তলায় যেন ছড়ানো রতন।”

কবি জীবনানন্দের কবিতায় দেশপ্রেম ধরা পড়েছে এভাবে-

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই আমি পৃথিবীর
রূপ খুঁজিতে যাই না আর; আকাশে জেগে ওঠে চুম্বনের গাছে চেয়ে দেখি ছায়ার মত বড় পাতার নিচে
বসে আছে ভোরের দোয়েল।”

এছাড়া মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগাবধি বহু কবির কবিতায় দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে।

দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত : দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রথমেই স্মরণে আসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কথা। মদিনায় হিজরতকালে জন্মভূমি মক্কার দিকে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছেন। উপমহাদেশের ক্ষেত্রে বাংলা এক ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মহাত্মা গান্ধী, ইসা খাঁ, তিতুমীর, জর্জ ওয়াশিংটন, নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিদেল ক্যাস্ত্রো প্রমুখ ব্যক্তিত্ব দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

দেশপ্রেমের নামে নৈরাজ্য : স্বদেশপ্রেম হবে নিষ্কলুষ। কিন্তু স্বদেশপ্রেমের মহান এই আদর্শ থেকে আমরা বিচ্যুত হয়ে দেশপ্রেমের নামাবলী গায়ে জড়িয়ে অনেক সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করি। অনেক রাষ্ট্রনায়ক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এদেরকে দেশপ্রেমিক না বলে দেশের শত্রু বলা শ্রেয়। এদের কারণেই দেশ ও জাতি আজ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। মুসোলিনি, জার্মানির হিটলার, শুধু দেশবাসীকেই কাঁদায়নি। বিশ্বমানবকেও কাঁদিয়েছে। তাই মানুষ তাদের কথা স্মরণ করে তীর ঘৃণার সাথে।

উপসংহার : মানুষের নিকট পরম সাধনার ধন, কামনার অক্সয় যে দেশ আলো দিল, বাতাস দিল, মুখে দিল অন্ন-জল, পরনে দিল বস্ত্র, সে শ্যামল স্নেহে প্রতিপালিত সন্তানদের মমতাময়ী আশ্রয়তা বোধ না থাকলে তাদেরকে কেবল অকৃতজ্ঞ নয়, অধমও বলা চলে। তাই কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর লেখায়—

“কিন্তু যে সাধেনি কভু জন্মভূমির
স্বজাতির সেবা যেবা করে নি কিছুও
জানাও সে নরাধম জানাও সে পশুর,
অতীব ঘৃণিত সেই পাশব বর্বর।”

সুতরাং জন্মভূমির প্রতি প্রেম থাকা সকলের একান্ত কর্তব্য। যতই বড়–ঝঞ্ঝা, বিপদ–আপদ আসুক না কেন, আমাদেরকে জীবন দিয়ে দেশকে রক্ষা করা উচিত। এতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

আরো পড়ুনঃ রচনা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প

স্বদেশ প্রেম রচনা ৩০ পয়েন্ট

সংকেত : ভূমিকা, স্বদেশপ্রেমের স্বরূপ, স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি, স্বদেশপ্রেম ও আমাদের করণীয়, স্বদেশপ্রেমের উপায়, আদর্শ দেশপ্রেমিক, স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম, উপসংহার।

ভূমিকা : সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘ঈশ্বরের ভক্তি তিন, দেশপ্রেম সর্বাপেক্ষা গুরুতর ধর্ম।’ সংস্কৃত-শ্লোকে আছে, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। বস্তুত নিজের দেশকে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। হৃদয়ের গভীর থেকে অকৃত্রিম অনুরাগে নিজের দেশ, দেশের মাটি এবং দেশের মানুষকে ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেম মানুষের উন্নতচরিত্রের সঙ্গে প্রাপ্ত স্বভাবজাত এক মহৎ গুণ। বৃহত্তর অর্থে মানুষ ধরিত্রী সন্তান। এই বিশাল পৃথিবীর যে ভূখণ্ডে যে মানুষ জন্ম নেয়, সেখানকার আলো-বাতাস-ধূলিকণায় তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, যে রাষ্ট্রের ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতিতে তার একাত্ম হওয়ার আকৃতি সেই দেশই হলো তার স্বদেশ। আর সেই দেশের প্রতি মমত্ববোধই হলো তার স্বদেশপ্রেম। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নিঃস্বার্থভাবে তার স্বদেশকে ভালোবাসে এবং জীবনান্তে তার প্রত্যাশা কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অভিব্যক্তিতেই যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে-

ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি-
আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতেই মরি।

স্বদেশপ্রেমের স্বরূপ : যেকোনো মানুষ স্বদেশের মাটি, স্বদেশের জল, আকাশ-বাতাস, পরিবেশ, মানুষ, কৃষ্টি- এই সবকিছুর মধ্যে শৈশবকাল থেকেই মায়ের আদরে পুষ্ট হতে থাকে। স্বদেশের সঙ্গেই গড়ে ওঠে তার নাড়ির সম্পর্ক। তার দেহ-মন, বিশ্বাস-আদর্শ সবকিছুই স্বদেশের বিভিন্ন উপাদান দ্বারা পুষ্ট হয়। ফলে স্বদেশের প্রতি তার যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয় তা অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা বহিঃপ্রকাশ এবং কর্তব্য ও দায়িত্বের অনিবার্য দায়বদ্ধতা। বস্তুত মা, মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার মধ্যেই দেশপ্রেমের মূল সত্তা নিহিত। সে কারণে, স্বদেশের ভাষা-সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমাজ-সংস্কৃতি এবং জীবন ও পরিবেশের সঙ্গে একজন মানুষের যেমন শেকড়ের বন্ধন গড়ে ওঠে, তেমনি মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি সৃষ্টি হয় তার চিরায়ত ভালোবাসা। ভালোবাসার এই আবেগময় প্রকাশই হলো দেশপ্রেম। শুধু মুখে মুখে ভালোবাসার কথা বললেই তাকে দেশপ্রেমিক বলা যায় না। নাগরিকের চিন্তা, কথা ও কাজে দেশের জন্য যে ভালোবাসা এবং দেশের মঙ্গল করার প্রত্যয় প্রকাশ পায় সেটাই প্রকৃত দেশপ্রেম।

স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি : গর্ভধারিণী জননীকে সন্তান যেমন ভালোবাসে তেমনই দেশ মাতৃকাকেও মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই শ্রদ্ধা করতে এবং ভালোবাসতে শেখে। বলা যায়, এই ভালোবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, প্রাকৃতিকভাবে ব্যক্তি মানুষের হৃদয়ে আপন-আপনি সৃষ্টি হয়। নিজের দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ব্যক্তির যে বন্ধন ও আকর্ষণ তা থেকেই স্বদেশপ্রেমের জন্ম। দেশ যত ক্ষুদ্র বা যত দরিদ্রই হোক না কেন, প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের কাছে তার জন্মভূমি, তার দেশ সবার সেরা। স্বদেশের প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেকোনো ব্যক্তি তার ধন, জন, মান, এমনকি জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। দেশে যখন সংকট উপস্থিত হয় যখন বহিঃশত্রুর আক্রমণে দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়, যখন দেশের মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজন হয় তখনই আসে মানুষের স্বদেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা। তখন দেশভাষার শ্রেণি, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র সব ভুলে একই ভাবচেতনায় দেশবাসীকে উজ্জীবিত করে।

স্বদেশপ্রেম তখন মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। দেশের মর্যাদার জন্য মানুষ অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেয়। স্বদেশপ্রেম অকৃত্রিম উদার এবং খাঁটি। স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি আইনস্টাইন আনন্দের ভাষায় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন-

‘জীবনকে ভালোবাসি সত্য, কিন্তু দেশের চেয়ে বেশি নয়।’

স্বদেশপ্রেম ও আমাদের করণীয় : ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা দেশপ্রেমের আকাঙ্ক্ষা। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতিতে দেশপ্রেমের রূপ ভিন্ন। কিন্তু প্রকৃতি একই রকম। স্বদেশপ্রেম প্রতিটি মানুষের হৃদয়কেই কাঁদায়। মহাকবি মাইকেল এর ভাষায় বলতে হয়-

বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দল
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মেটে কার জলে?

উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছেন, ‘সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তারা, যারা দেশকে দলের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে না।’ আমাদের জাতীয় জীবনে দেশপ্রেমের চেতনাকে জাগিয়ে রাখতে হবে উজ্জ্বল শিখার মতো। অকৃত্রিম দেশপ্রেমই জাতিকে উদ্ধার দিয়েছে। মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীনতা। আমাদের ইতিহাস ত্যাগের ইতিহাস। যেকোনো মূল্যে আমরা দেশের স্বাধীনতা ও ভাষার মর্যাদা রক্ষা করব। বিনিময়ে আমাদের রক্ত দিতে হয় দেবে, আমরা প্রস্তুত।

স্বদেশপ্রেমের উপায় : কবির ভাষায়-

“স্বদেশের উপকারে নেই যার মন
কে বলে মানুষ তাকে পশু সেই জন।”

পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম নেই, যে ধর্ম দেশকে ভালোবাসার নির্দেশ দেয়নি। দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মত্যাগকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। মানুষ জীবনে যেকোনো সময় যেকোনো স্থান থেকে দেশকে ভালোবাসতে পারে। নিজ জাতির জন্য, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তা সে ছোট কাজই হোক বা বড়-প্রত্যেক মানুষেরই কিছু না কিছু করার আছে। কেবল কবি-উপন্যাসিকরা তাদের সাহিত্যসম্ভারের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে জ্ঞানলোক বিস্তার করে দেশের প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত করতে পারেন। দেশের কল্যাণে ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখে বিশ্বভাষায় অনন্য যেসব দেশের গৌরব বাড়ানো যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জগদীশচন্দ্র বসু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের অবদানে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

আদর্শ দেশপ্রেমিক : পৃথিবীতে যশে যশে বহু দেশপ্রেমিক জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের মেধা, শ্রম ও কর্ম দিয়ে পৃথিবীকে সুন্দর করে সাজিয়েছেন। তাঁদের হাতে সৃষ্টি হয়েছে সভ্যতা, আধুনিক সমাজ বা রাষ্ট্র। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, মহাত্মা লেনিন, জর্জ ওয়াশিংটন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্শাল টিটো, ইমাম আরাফাত, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় স্বদেশপ্রেমের অমর বাণী উচ্চারিত হয়েছে বারবার। তাঁদের দেশপ্রেম বিশ্বপ্রেমে রূপ নিয়েছে। দেশপ্রেমিক না হলে বিশ্বপ্রেমিক হওয়া যায় না। স্বামী বিবেকানন্দ দেশকে ভালোবেসেছিলেন বলেই বিশ্বপ্রেমের অমর বাণী প্রচার করেছেন। দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের মানুষকে ভালোবাসা। দেশের মানুষকে ভালোবাসলে পৃথিবীর সকল মানুষকে ভালোবাসা যায়। মাদার তেরেসা, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, রেডক্রসের প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ডুনান্ট প্রমুখ বিশ্ব মানবসেবীদের নামও স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

উপসংহার : পৃথিবীতে বীর, বিপ্লবী, ত্যাগী মহৎ দেশপ্রেমিক মানুষেরা তাঁদের বীরত্ব ও ত্যাগের মহান আদর্শ রেখে গেছেন। স্বদেশপ্রেমের শক্তিতেই তাঁরা পৃথিবীকে করতে চেয়েছেন সুন্দর, কল্যাণকর ও শান্তিময়। মূলত দেশপ্রেম মানবজীবনের একটি শ্রেষ্ঠ গুণ এবং অমূল্য সম্পদ। একটি মহৎ গুণ হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই দেশপ্রেম থাকা উচিত। দেশপ্রেমের মূল লক্ষ্য মানুষকে ভালোবাসা। তাই দেশপ্রেম বিশ্বপ্রেমেরই অংশ বিশেষ। ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেশকে ভালোবাসাই দেশপ্রেম। আর দেশের ঊর্ধ্বে সমগ্র পৃথিবীকে ভালোবাসাই বিশ্বপ্রেম। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার চরণ দুটি প্রণিধানযোগ্য-

ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা
তোমাতে বিশ্বময়ী, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।

পরিশেষে বলা যায়, দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতির জন্য কিছু না কিছু অবদান রাখা প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। কেননা, আমরা জানি-

নিজের প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

তো এই ছিল আজকের স্বদেশপ্রেম রচনা, কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানাও। আর যদি রচনাটি পড়ে উপকৃত হউ, তাহলে সকলের সাথে শেয়ার করতে পার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top