আজকে তোমরা শিখবে দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান রচনা। আমরা ২০ পয়েন্ট ও ১৫ পয়েন্ট-এ সর্বমোট দুইটা নমুনা উপস্থাপণ করেছি, আশা করি তোমাদের পরীক্ষার জন্য উপযোগী হবে। এই রচনাটি সকল ধরণের পরীক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই দেরি না করে এখনি শিখে নাও।
| পোস্টের বিষয়বস্তু | রচনা লিখন |
| রচনার টপিক | দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান |
| প্রযোজ্য শ্রেণিসমূহ | ক্লাস ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, এসএসসি, এইচএসসি |
| নমুনা দেয়া হয়েছে | ২টি |
দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান রচনা (১)
ভূমিকা : আজকের সভ্যতা উন্নত, বহু দিকে বিকশিত। এই উন্নতি ও বিকাশের পশ্চাতে সাহিত্য, সংগীত, ব্যাবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞান ইত্যাদির অবদান রয়েছে। কিন্তু গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে দেখলে মনে হয়, বিজ্ঞানের অবদান অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। সমাজের চেহারাই বদলে দিয়েছে বিজ্ঞান। মানুষকে বিরাট ও বিপুল শক্তির অধীশ্বর করে সভ্যতার নবনব পথ সে উন্মুক্ত করেছে।
মানবজীবন ও বিজ্ঞানের সূচনা : বিজ্ঞান অর্থ বিশেষ জ্ঞান। অর্থাৎ, কোনো বিষয়ের সার্বিক তথ্য ও তত্ত্বের সম্যক জ্ঞানার্জনই বিজ্ঞান। সেই অর্থে মানবসভ্যতার সূচনালগ্নে বিজ্ঞান তাই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লেগেছে। সভ্যতার সেই শুরুতে বিজ্ঞান মানবজীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। যেমন- মিশরীয় সভ্যতা, গ্রিক ও রোমান সভ্যতা, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সূচনায় দেখা যায় মানুষের চিন্তা-চেতনায় বিজ্ঞানের ধারণার উন্মেষ ঘটেছে।
বিজ্ঞান ও মানবজীবন : বিজ্ঞান এমন এক বিশেষ জ্ঞান, যা পরীক্ষা-প্রমাণ, যুক্তি আর অভিজ্ঞতার দ্বারা নির্ণেয় এবং প্রতিষ্ঠিত। এই জ্ঞানকে অর্জন করেই মানুষ করায়ত্ত করেছে বিশ্বপ্রকৃতিকে। একে প্রয়োগ করেছে তার নিজের প্রয়োজনে। বিজ্ঞান আমাদের অন্তজীবনকে প্রভাবিত করেছে, বহির্জীবনে এনেছে নানা পরিবর্তন। যে নিশীথ অন্ধকার যুগ যুগ ধরে শিশু মনে ছড়িয়ে দিত আধিদৈবিক শক্তির ভয়-বিহ্বলতা, বিদ্যুতের তমসাভেদী দীপ্তি তাকে দিলো সাহসবিস্মৃত বক্ষপট। ভাগ্যবিধ্বস্ত, রোগক্লান্ত মানুষ একদিন রোগমুক্তির প্রত্যাশায় ধরনা দিত অন্ধ দেবতার দুয়ারে। বারবার নিরর্থক ছুটে যেত অশিক্ষিত সংস্কারান্ধ ওঝার দ্বারপ্রান্তে।
বিজ্ঞান আজ তার কাছে পৌঁছে দিয়েছে জীবনদায়ী বিশল্যকরণী। যে মানুষ একদিন মেঘের গর্জন শুনে, বিদ্যুৎ চমক দেখে ভয়ে মুখ লুকাতো, বিজ্ঞান তাকেই তার বশীভূত করল। মুমূর্ষুকে দিলো প্রাণের আশ্বাস। অন্ধকারে দিলো আলোর সন্ধান। বিজ্ঞানের স্পর্শেই বন্ধ্যা ও অনুর্বর ভূমি হলো উর্বর, সম্ভব হলো কৃষিকার্য। বিজ্ঞানই দিগন্তব্যাপী সবুজের সমারোহ ছড়িয়ে দিলো তার বুকে। সোনার ফসলে ভরে উঠল তার শস্যাভাণ্ডার। বিজ্ঞানই কূলপ্লাবী উচ্ছল নদীতরঙ্গকে করল সেতু শৃঙ্খলিত। সমুদ্রের বক্ষ ভেদ করে তুলে আনল কত মণিমুক্তা। অতল ভূগর্ভের খনিজ সম্পদ। বিদ্যুৎশক্তি তাকে দিলো নবনব শিল্পপ্রতিষ্ঠান উদ্ভাবনের ক্ষমতা। বিজ্ঞান যথার্থই মানুষকে করে তুললো অমৃতের সন্তান।
বাস্তবজীবনে বিজ্ঞানের বহুমুখী প্রয়োগ : বিজ্ঞান ব্যতীত এ যুগের সভ্যতা অচল। জল ও বাতাস বাদ দিলে যেমন জীবনের কাজকর্ম স্তব্ধ হয়ে যায়, বিজ্ঞানকে বাদ দিলেও তেমনি সভ্য জগৎ প্রাণহীন ও নিস্পন্দ হয়ে পড়ে। এ যুগে প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পদক্ষেপে, সভ্য মানুষ বিজ্ঞানের কাছ থেকে রসদ আহরণ করে জীবনধারণ করছে। বিজ্ঞানকে বাদ দিলে (আজ) তার অস্তিত্বই বিপন্ন (প্রায়) হয়ে যাবে।
যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিজ্ঞান : বিজ্ঞান আজ দূরকে করেছে নিকট। পৃথিবীকে আমাদের ঘরের একেবারে কোণটিতে এনে দিয়েছে। দূরদূরান্তের আজ আমরা অতি সহজে পাড়ি দেই। এমনকি পৃথিবীতে বসে চাঁদে দাঁড়িয়ে থাকা অভিযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলি। মহাকাশে রকেট পাঠিয়ে মঙ্গল গ্রহের শিলাস্তরের ছবি তুলি। বিমান, রেলগাড়ি, মোটরগাড়ি ইত্যাদি যানবাহনের মাধ্যমে আজ যুগান্তর এনেছে বিজ্ঞান। অতীতে দূরান্তের ভ্রমণ মানেই ছিল বিপদআপদ ও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া। হেঁটে, নৌকায় চেপে অতি কষ্টে মানুষ পথ চলত। বিজ্ঞানের দৌলতে শুধুমাত্র যে যাতায়াত ব্যবস্থারই উন্নতি হয়েছে, তা নয়। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এসেছে যুগান্তর। টেলিগ্রাফ বা টেলিফোনের সাহায্যে আজ আমরা বহু দূরের লোকের সঙ্গে কত স্বল্প সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারি। এছাড়া আছে বেতার সংকেত বা রেডিও সিগন্যাল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে এর অবদানও কম নয়।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান : চিকিৎসা বিজ্ঞানেও আজ এসেছে যুগান্তর। মানুষ বিজ্ঞানের আশীর্বাদে বহু দুরারোগ্য ব্যাধিকে প্রায় নির্মূল করেছে। উদাহরণস্বরূপ- কলেরা, বসন্ত, টাইফয়েড, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ক্যানসার ইত্যাদি রোগের কথা বলা যায়। অবশ্য সন্দেহ নেই আমাদের বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে এই রোগগুলোর কোনো কোনোটির প্রাদুর্ভাব এখনও রয়েছে। জীবাণু আবিষ্কার হলো বিভিন্ন রোগ নির্মূল করার পেছনের আদিকথা। অর্থাৎ, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যে রোগগুলোর জীবাণু বা ভাইরাস আবিষ্কার করতে পেরেছে, সেসব রোগের টিকা ও ঔষধও আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে লুই পাস্তুর, জেনার, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং প্রমুখ বিজ্ঞানীদের অবিস্মরণীয় অবদান। পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। এই আশ্চর্য ওষুধটি যে আজকের দিনে কত কাজে লাগছে, কত মুমূর্ষু জীবন যে এর সাহায্যে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে— তা বলে শেষ করা যায় না।
বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতিতে এক্স-রে বা রঞ্জনরশ্মির গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। এর সাহায্যে শরীরের ভেতরকার বিভিন্ন জায়গার ছবি তুলতে পারি আমরা। চিকিৎসা শুরু করার আগেই রোগীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে পারি। রঞ্জনরশ্মি এবং বিভিন্ন আবিষ্কারের দৌলতে আজ শল্য চিকিৎসা বা সার্জারিতে এসেছে যুগান্তর। আজ ভাঙা হাত-পা জোড়া দেওয়া তো বটেই, পেট-বুক এমনকি মস্তিষ্কেরও অস্ত্রোপচার সম্ভব হচ্ছে। শল্য চিকিৎসার সাহায্যে বহু কঠিন রোগ নির্মূল করা হচ্ছে আজকাল। রুগ্ণ ব্যক্তির দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া অকেজো হৃৎপিণ্ডের জায়গায় নতুন হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো হচ্ছে। অবশ্য সন্দেহ নেই, হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে শল্য চিকিৎসা এখনও পুরোপুরি সাফল্য লাভ করেনি।
প্রকৌশল ক্ষেত্রে বিজ্ঞান : বিজ্ঞানের একটি শাখা কারিগরি বিজ্ঞান বা ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স। সভ্যতার উন্নতি বা বিকাশে এর অবদান বিস্ময়কর। প্রকৌশল বিদ্যার সাহায্যে আজ অসম্ভব হচ্ছে সম্ভবপর। অকল্পনীয় যা ছিল তা রূপ পাচ্ছে বাস্তবে। খরস্রোতা, প্রমত্তা যে নদীকে দেখে মানুষ একদিন ভয় পেত, প্রকৌশল বিদ্যার বদৌলতে সে নদীতে আজ বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। নদীর জলধারাকে আটক করে তা থেকে খাল কেটে নিয়ে জলসেচনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া, অতি অল্প খরচে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হওয়ায় সমাজ ও সভ্যতা নানাভাবে উপকৃত হচ্ছে। ঐ বিদ্যুৎ শক্তি থেকে লাখ লাখ ঘর আজ আলোকিত হচ্ছে, হাজার হাজার কলকারখানায় স্বল্প ব্যয়ে নানা দ্রব্যাদি উৎপাদিত হচ্ছে।
বড়ো বড়ো সেতু নির্মাণ করে, পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গপথ গড়ে, এমনকি মরুভূমিতে ফসল ফলিয়ে কারিগরি বিজ্ঞান আজ অসাধ্য সাধন করেছে। গৃহনির্মাণ, পথঘাট তৈরি, সেতু গড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রেও আজ এসেছে নবযুগ। মানুষ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্বের দুর্গম পথের বাধা অতিক্রম করে হাইওয়ে গড়ছে, বড়ো বড়ো নদীর বিভিন্ন স্থানে সেতু নির্মাণ করে প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে।
পারিবারিক জীবনে বিজ্ঞান : বিজ্ঞান আমাদের জীবনকে বিস্তৃতি দিয়েছে। সুদূরকে করেছে নিকট। ঘুচিয়ে দিয়েছে স্থানিক এবং মানসিক সংকীর্ণতা। প্রতিদিন প্রভাত কলরবের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্র আমাদের গৃহে পৌঁছে দেয় বিশ্বের অসংখ্য সংবাদ কণিকা। বেতারে ধ্বনিত হয় বিশ্ববার্তা। টিভির পর্দায় ভেসে ওঠে পৃথিবীর দূরদূরান্তের ছবি, নিখিল মানুষের চলমান স্রোত। ঘুম থেকে ওঠা হতে শুরু করে রাতে শুতে যাওয়া পর্যন্ত বিজ্ঞান শক্তির অকৃপণ দাক্ষিণ্য লাভ করতে করতে চলেছি আমরা। আমাদের দিনযাপনের প্রতিটি মুহূর্তকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে বিজ্ঞান। অভ্যস্ত জীবনধারায় কোনো ছন্দপতন ঘটলেই উপলব্ধি করি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিজ্ঞানের ভূমিকা কত ব্যাপক ও গভীর। হঠাৎ যখন বিদ্যুতের আলোকোজ্জ্বল রাত্রি গভীর অন্ধকারে ডুবে যায়, তখনই বুঝতে পারি, বিজ্ঞান আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে কী গভীরভাবেই সম্পৃক্ত। বিজ্ঞান আজ আমাদের জীবনকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। কর্মব্যস্ততার মুহূর্তে দূরভাষের সাহায্যে আমরা প্রয়োজনীয় কাজটুকু ঘরে বসেই সেরে নিতে পারি।
আবার কাজের অবসরে শীতাতপ কোনো বিলাসী প্রেক্ষাগৃহে রঙিন চিত্রায়িত কাহিনী দেখে ক্লান্তি অপনোদন করতে পারি। প্রিয়মুখকে যেমন ধরে রাখতে পারি সেলুলয়েডের স্বচ্ছ আধারে, তেমনি প্রিয় কণ্ঠকেও চিরকালের জন্য বেঁধে রাখতে পারি টেপের অদৃশ্য রেখা তরঙ্গে। দ্রুততর কোনো যানে দ্রুতগামী বিমানে করে বিদেশ থেকে আনতে পারি মহামূল্যবান কোনো বস্তু। এ কথা আজ অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, আমাদের জীবন দিনদিন হয়ে উঠেছে বিজ্ঞাননির্ভর। হাঁটার চেয়ে বাসে, কারে, মোটরে চালাতেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। পরিধেয় বস্ত্র থেকে ঘরবাড়ি, পথঘাট, ওষুধ-পথ্য, কৃষিজ, খনিজ, ভোগ্যপণ্য সবই বিজ্ঞানের প্রযুক্তিবিদ্যার ফসল। প্রতি মুহূর্তে শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বেঁচে থেকেও যেমন বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আমরা প্রতিনিয়ত সচেতন নই, ব্যবহারিক জীবনেও বিজ্ঞানের অজস্র উপাচারেও আমরা এমনই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, সেকথা স্বতন্ত্রভাবে আমরা আর স্মরণ করি না। আর এভাবেই বিজ্ঞান আমাদের ব্যবহারিক জীবনে এনেছে মৌল পরিবর্তন।
উপসংহার : একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে বিজ্ঞানের বহুল প্রয়োগের যুগে বিজ্ঞান শক্তির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করে বিজ্ঞানের ব্যবহারকে করতে হবে জীবনমুখী। বিজ্ঞানকে করতে হবে আমাদের জীবনের প্রগতির বাহন।
আরো পড়ুন: অধ্যবসায় রচনা
দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান রচনা (২)
সংকেত : ভূমিকা, বিজ্ঞানের সৃষ্টি, দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান, কায়িক শ্রম লাঘবে বিজ্ঞান, কৃষিকাজে বিজ্ঞান, উন্নত চিকিৎসায় বিজ্ঞান, শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান, তথ্য প্রদানে বিজ্ঞান, সম্পদ আহরণে বিজ্ঞান, আবহাওয়া নির্ণয়ে বিজ্ঞান, যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান, বিনোদনে বিজ্ঞান, উপসংহার।
ভূমিকা : মানুষ একসময় গুহায় বাস করত। কিন্তু এখন মানুষ বিজ্ঞানের আশীর্বাদে আধুনিক জীবনে পদার্পণ করেছে, বসবাস করছে আকাশচুম্বী অট্টালিকায়। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে পৃথিবী আজ মানুষের হাতের মুঠোয়। বিজ্ঞানের অবদানে পৃথিবী আজ আলো ঝলমলে; মানবজীবন সুখী-সমৃদ্ধ, আরাম-আয়েশপূর্ণ ও নিরাপদ। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ আজ আকাশে-বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের বিশেষ অবদান রয়েছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতিও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বিজ্ঞানের সৃষ্টি : প্রকৃতির অন্ধ শক্তির ওপর জয়ী হওয়ার প্রয়োজনই একদিন সৃষ্টি হয়েছিল বিজ্ঞানের। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীবৃন্দ মানুষের কল্যাণের জন্য ডুব দিয়েছিলেন প্রকৃতির অতলান্ত রহস্য সাগরে। সেই রহস্যাবরণ উন্মোচন করে মানুষের প্রতিভা আবিষ্কার করেছে প্রকৃতির কত গোপন সম্পদ ও শক্তি। জলে-স্থলে-আকাশে মানুষের আজ অপ্রতিহত গতি। বর্বর জীবনকে পশ্চাতে ধাওয়া করে বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ আজ সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত ও সম্পদশালী। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা, জীবনের স্বপ্ন ও কল্পনার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে বিজ্ঞান।
দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান : বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি মুহূর্তও ভাবা যায় না। আধুনিক জীবন বলতে আমরা বুঝি যে জীবন চিন্তা-চেতনায় প্রগতিশীল, নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন এবং নতুনকে গ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর। তাইতো অন্ধকার গুহার পরিবর্তে আলোকপিয়াসী হয়ে মানুষ বেছে নিয়েছে সুদৃশ্য নিকেতন। বিজ্ঞানের অবদানে মানুষ আজ কাঁচা মাংসের পরিবর্তে প্রেসার কুকারে সিদ্ধ করা বা মাইক্রো ওভেনে রান্না করা খাদ্য খাচ্ছে, লজ্জা নিবারণে তৈরি করেছে নামি-দামি ব্র্যান্ডের পছন্দের পোশাক। মোটকথা বিজ্ঞানের স্পর্শে আজ আমাদের জীবন হয়েছে সহজ ও সুন্দর। বিজ্ঞানের যাত্রা শুরুর প্রথম ধাপেই দেখা যায় বিদ্যুতের বিস্ময়কর অবদান। তারপর এসেছে টেলিফোন, মুঠোফোন, টেলিভিশন, জেনারেটর, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ক্যামেরা, লিফট ইত্যাদি। আর এভাবেই অতীতের গ্লানি চিহ্ন মুছে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় আজ আমরা আধুনিক।
কায়িক শ্রম লাঘবে বিজ্ঞান : মানবকল্যাণের কথা চিন্তা করেই প্রাচীন যুগে বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আধুনিক বিশ্বে মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের অবদান রয়েছে। কায়িক শ্রম লাঘবেও বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। একসময় অল্প কিছু উৎপাদন করতে মানুষকে অনেক পরিশ্রম করতে হতো। কিন্তু বিজ্ঞানের বদৌলতে শিল্প-বিপ্লবের ফলে কল-কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এতে উৎপাদন বেড়েছে আর লাঘব হয়েছে কায়িক শ্রম।
কৃষিকাজে বিজ্ঞান : আদিম মানুষের জীবিকা উপার্জনের একমাত্র পথ ছিল কৃষি। আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিকাজের উন্নয়নের জন্যও বিজ্ঞান বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। কৃষিকাজের উন্নয়নের জন্যও বিজ্ঞান বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ সময় ও অনেক পরিশ্রম করে সনাতন পদ্ধতিতে লাঙ্গল-জোয়াল-গোরু দিয়ে হালচাষের পরিবর্তে দ্রুত চাষ করার জন্য বিজ্ঞান ট্রাক্টর আবিষ্কার করেছে। বেশি ফসল উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক সার ও অধিক ফলনশীল বীজ, ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ধ্বংসের জন্য কীটনাশক আবিষ্কার বিজ্ঞানের অবদান। তাছাড়া জমিতে সেচ প্রদান, ফসল রোপণ, কর্তন, মাড়াইসহ বেশকিছু কাজের জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করেছে বিজ্ঞান।
উন্নত চিকিৎসায় বিজ্ঞান : চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান সবচেয়ে বেশি। বিজ্ঞানের কল্যাণে রাতারাতি আধুনিক চিকিৎসা উন্নতির শিখরে পৌঁছে গেছে। বিজ্ঞানের কল্যাণেই আধুনিক মানুষ রোগহীন সুস্থ জীবনযাপন করছে, ছোটো-বড়ো নানা প্রকার রোগের হাত থেকে সহজেই মুক্তি পাচ্ছে। রোগাক্রান্ত হওয়ার আগেই মানুষ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করছে। যক্ষ্মা, হার্ট, কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, শিরা, যকৃৎ, ধমনি, পাকস্থলীতে আক্রান্ত রোগও বিজ্ঞানের কাছে হার মেনেছে। তাছাড়া রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্সরে, ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইটিটি, এন্ডোস্কপি যন্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ নিতে সৃষ্টি হয়েছে টেলিমেডিসিন পদ্ধতি। কৃত্রিম হাত-পায়ের ব্যবস্থা এমনকি নিঃসন্তান দম্পতির জন্য টেস্টটিউব বেবির ব্যবস্থাও করেছে আধুনিক বিজ্ঞান।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান : শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিশেষ অবদান রেখেছে। কাগজ, কলম ও মুদ্রণ যন্ত্র শিক্ষাক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। মুদ্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে জ্ঞানী-গুণীর কথা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। মূল্যবান গ্রন্থগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। বর্তমানে ঘরে বসে ইন্টারনেটে সব ধরনের জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব। তাছাড়া মোবাইল, টেলিভিশন, কম্পিউটারের মাধ্যমেও শিক্ষা লাভ করা যায়।
তথ্য প্রদানে বিজ্ঞান : বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। এই যুগে যেকোনো আলোড়িত ও আলোচিত ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। কম্পিউটার, টেলিফোন, মুঠোফোন, ই-মেইল, এসএমএস, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ইত্যাদি প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে বিজ্ঞানের কল্যাণে। তথ্য আদান-প্রদানের আরও উন্নত যন্ত্র টেলিপ্যাথি আবিষ্কারের পথে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে কথা বলার সময় অপর প্রান্তের মানুষের মনোভাব অনুভব করা যাবে। তাছাড়া ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পত্রিকা পড়া সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞান মানুষের জীবনের জটিলতাকে সকল ক্ষেত্রে সহজ থেকে সহজতর করে দিয়েছে।
সম্পদ আহরণে বিজ্ঞান : পৃথিবীতে বহু ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ আছে। এই সম্পদ আহরণ করতে আবিষ্কার করা হয়েছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি। বৈজ্ঞানিক এ পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মানুষ ভূ-গর্ভ থেকে তেল, গ্যাস, কয়লা, লোহা, চুনাপাথরসহ নানা সম্পদ আহরণ করছে এবং একেকটা সম্পদ একেক কাজে লাগিয়ে মানুষের চাহিদা পূরণ করছে। সমুদ্রের স্রোত, নদীর পানি বাতাসের গতিকেও বিজ্ঞান মানুষের কাজে লাগাচ্ছে। কাজে লাগাচ্ছে পরিত্যক্ত বর্জ্য ও পশু-পাখির বিষ্ঠাকেও।
আবহাওয়া নির্ণয়ে বিজ্ঞান : এক সময় মানুষ আবহাওয়ার পূর্বাভাস বুঝে নিত অভিজ্ঞতা ও ঋতু চক্রের মাধ্যমে। কোন ঋতুতে আবহাওয়া কেমন ছিল তার ওপর ভিত্তি করে তারা চলত। এতে বড়ো বড়ো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাতো এবং প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হতো। পূর্বে বন্যা, সুনামনি, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়ে অসংখ্য মানুষ, গবাদি পশুসহ ঘরবাড়ি ও পরিবেশের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ মানুষকে আর এই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় না। বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ এক-দু’দিন আগেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে যায়। ফলে তারা বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যথাসময়ে অবস্থান নেয় এবং দুর্যোগ মোকাবিলা করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়।
যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান : এক সময় মানুষ ছিল গৃহকেন্দ্রিক। কোথাও যেতে হলে পায়ে হেঁটে যেতে হতো। কেননা তখন কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এ যুগে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। যানবাহনের মাধ্যমে মানুষ এখন জলে, স্থলে, আকাশে, গ্রহে, উপগ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থলপথে গাড়ি, ট্রেন, জলপথে জাহাজ, আকাশপথে বিমান, ভিন্ন গ্রহে যেতে রকেট ইত্যাদি বিজ্ঞানেরই অবদান।
বিনোদনে বিজ্ঞান : মন ভালো তো সব ভালো। মন ভালো থাকলে পড়ালেখা, কাজকর্ম সবকিছুই ভালো লাগে। তাই মানুষের মনকে প্রফুল্ল রাখতে বিজ্ঞান নানা প্রকার বিনোদনের ব্যবস্থা করেছে। বিজ্ঞান আধুনিক মানুষের বিনোদনসঙ্গী হয়ে ধরা দিয়েছে। বিশ্বসংস্কৃতি আজ বিজ্ঞানে পরিপূর্ণ হয়েছে। মোবাইল, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, ক্যামেরা, ডিভিডি, ভিসিডি, ভিসিআর, ডিশ, বৈদ্যুতিক বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তাই কর্মশেষে কর্ম ক্লান্ত মানুষ বিনোদনের মাধ্যমে মনকে উৎফুল্ল করে তোলে।
উপসংহার : বিজ্ঞান অনুসন্ধানী, আধুনিক জীবনে ক্রমপ্রবহমান ছন্দের মূল চালিকাশক্তি। বিজ্ঞানের একের পর এক আবিষ্কারে মানুষ স্তম্ভিত হচ্ছে। শহরজীবনে বিজ্ঞান যেমন প্রভাব বিস্তার করেছে, গ্রামীণ জীবনধারায় ঠিক সেভাবে সম্ভব হয়নি। তাই সচেতন জনসাধারণের প্রত্যেকেরই কর্তব্য গ্রামীণ জীবনধারাতেও বিজ্ঞানের বিস্তৃত ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। কেননা, বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড গ্রাম-বাংলায় বিজ্ঞানের যথার্থ প্রয়োগই পারে তার উদ্ভাবনী শক্তিকে জাদুস্পর্শে সমৃদ্ধ করতে।




এই রচনাটা সত্তিকার অর্থে অসাধারণ
আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য ধন্যবাদ।