শীতের সকাল রচনা – ক্লাস ৫,৬,৭,৮, ৯-১০, এসএসসি, এইচএসসি

শীতের সকাল রচনা: আজকে তোমরা শিখবে শীতের সকাল রচনা ১৫,২০,২৫ পয়েন্ট, যা সকল ক্লাসের জন্য উপযোগী। এই রচনাটি শীতকালে যেকোন পরীক্ষায় অনেক বেশি কমন পড়ে। তাই শিখে নাও গুরুত্বপূর্ণ এই শীতের সকাল রচনা। তাহলে শুরু করা যাক-

পোস্টের বিষয়বস্তুরচনা লিখন
রচনার টপিকশীতের সকাল
প্রযোজ্য শ্রেণিসমূহক্লাস ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, এসএসসি, এইচএসসি
নমুনা দেয়া হয়েছে৩টি

শীতের সকাল রচনা – ক্লাস ৫, ৬, ৭

ভূমিকা : বাংলাদেশে ঋতুচক্র নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। শীতকালও নিজ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। পৌষ ও মাঘ এ দুই মাস শীতকাল। তবে অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি থেকে ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত শীত থাকে। শীতের আগমনে প্রকৃতির সর্বত্র পরিবর্তন দেখা যায়। শীতের সকাল এক পৃথক সৌন্দর্য ও মাধুর্য নিয়ে আসে। সূর্যের আলো ফোটার আগেই পাখির কলকলানি সকালের আগমনবার্তা জানিয়ে দেয়।

শীতের সকালের রূপ : ধীরে ধীরে কুয়াশার আচ্ছাদন ভেদ করে সূর্যমামা আলো ছড়াতে থাকে। উত্তরের হিমশীতল হাওয়া বইতে থাকে ধীরে ধীরে। বনের গাছগুলোর পাতা থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়ে শিশির। শিশিরভেজা দূর্বাঘাসে কিংবা টিনের চালে সূর্যালোক পড়লে মনে হয় মুক্তা ঝলমল করছে। মানুষ আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে পায়চারি করতে থাকে, সূর্যের কিরণে গায়ে বসে কিংবা আগুন জ্বালিয়ে চতুর্দিকে কুঁড়ুলী পাকিয়ে বসে। ধীরে ধীরে শীতের সকাল কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে। মৌমাছিরা গুন গুন শব্দে দ্রুত বেগে ছুটে যায় হলুদ শস্যের ফুলের আকর্ষণে। এ সময় ফোটে হলুদ রঙের উজ্জ্বল গাঁদা ফুল।

শীতের সকালের কৃষাণ-কৃষাণী : কৃষাণ মৌসুমি শস্য বিশেষ করে ধান তোলা নিয়ে কর্মব্যস্ত। অন্যদিকে শাকসবজি খেতের তদারক করতে হয়। সকাল বেলাতেই দেখে আসতে হয় একবার কী অবস্থা সবজি বাগানের। কৃষাণী ব্যস্ত বিভিন্ন রকম পিঠা তৈরি করে পরিবারের সবাইকে উপহার দিতে। কখনো কখনো খেজুরের পাটালি তৈরি করে পরিবেশন করেন সবাইকে। শীতের পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড় মিশিয়ে খেতে কতই না মজা! তাই তো কবি সুফিয়া কামাল কবিতায় ধরে রেখেছেন সে আনন্দময় পরিবেশকে-

“পৌষমাসে পিঠা
খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে
আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মোর মায়ের বকুনি পেয়ে।”

শীতের সকালে গ্রামের ছেলেমেয়েরা : শীতের সকালে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গ্রাম মক্তবে রোদ পোহাতে পোহাতে আরবি শিক্ষা করে। অনেকেই বাড়ির আঙিনায় রোদের মাঝে মাদুর পেতে বাল্যশিক্ষার পাঠ নেয় কিংবা কবিতা মুখস্থ করে। অন্যরা নানা কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

শীতের সকালে শহরের অবস্থা : শহরে কাকের ডাকে ভোরে সবার ঘুম ভাঙে। শহরেও শীতের সকালে নানা রূপ দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিচিত্র রঙের জ্যাকেট, সোয়েটার ও কোট পরিহিত অফিস অভিমুখী মানুষগুলোকে দেখলে বড় সুন্দর লাগে। শীতের জড়তা কাটিয়ে সময়মতো অফিসে উপস্থিত হওয়া কষ্টকর হয়। শীতের প্রকোপে জ্যাকেট কিংবা প্যান্টের পকেট থেকে সহজে হাত বেরোতে চায় না। এমন শীতের সকালে গরম চা কার না পছন্দ! তাই রাস্তার মোড়ে চা দোকানগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে শীতের সকালে। শহরে শীতের সকালে ফেরিওয়ালারা খেজুরের রস নিয়ে ডাকাডাকি করে।

শীতের সকালে নদ-নদীর দৃশ্য : শীতকালে নদ-নদীগুলোর পানি কমে যায়। সকাল বেলা নদীর পানি থেকে কুয়াশার ধোঁয়া সৃষ্টি হয়ে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করে। মাছগুলোও পানিকে আশ্রয় করে তলায়। সূর্যের আলো পড়লে সে পানি রূপালি বর্ণ ধারণ করে। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের সূর্য কুয়াশা ভেদ করে উঠতে থাকে। প্রত্যাশিত রোদে চারদিক ভেসে যায়। তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতবস্ত্র খুলে হালকা হাওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়।

উপসংহার : শীতের সকালের একটি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ও মাধুর্য রয়েছে। শীতের সকালের সেই বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পেতে হলে সুদূর গ্রামে যেতে হবে। শহরের ইট-পাথরের কৃত্রিম পরিবেশে গ্রামের শীতের সকালের মিশ্রধর্মী রূপটির সন্ধান পাওয়া কঠিন।

আরো দেখুনঃ দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান রচনা

শীতের সকাল রচনা – ক্লাস ৮, ৯, ১০

ভূমিকা :
পূর্ব দিগন্তে অরুণ আলোর সমাবেশে ফুটে ওঠে। অথচ বনে বনে পাখিদের কোলাহলও ধীরে ধীরে পড়ছে। নানাজনের ভাবের সুখ কষ্টে মিশে থাকে জীবনের কল্যাণকর আনন্দ রাগিণী। এমনই পূর্ব দিগন্তে আলোর বেলায় রঙিন হয় সকাল শীতল শীতের সকাল তাকে স্বাগত জানানোর জন্য বনে বনে পাখির কণ্ঠে উচ্চারিত হয় গীতি। তাদের শিরিশমিশ কণ্ঠে আনন্দের অনুরণন জাগে। কুয়াশার কণ্ঠে ভেসে ওঠা শীতের সকাল। আর বিলম্ব বেশি নেই। সকালবেলার মধ্যেই কুয়াশা ধূসরতা ছিন্ন করে আমাদের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আলো ঝলমলে একটি পরিপূর্ণ সকাল।

সূর্যোদয়ের পূর্বে শীতের সকাল :
ভোরের নিস্তব্ধতা তখনও কাটে না, শিশিরে ভেজা শীত কণ্ঠে কাঁপে, ধরা থাকে। গরম বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলেই কেমন এক দুর্নিবার আলস্য সমস্ত চেতনাকে ঘিরে ধরে। তখন দূরবিতরণে পাখিদের কল-গুঞ্জন শোনা যায়, আর শোনা যায় পথচারীদের বাতাসে ভেসে আসা দু-একটি শব্দ। চারদিকে পৃথিবী এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতায় মগ্ন। শীতের সকালে তাই এক নিঃসঙ্গ জড়তা সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন রাখে। ঘন কুয়াশার আবরণে পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হয়। মানুষ আলস্যে শয্যায় পড়ে থাকে এবং কল্পনা করতে থাকে—শীতের বুড়ি কুয়াশার কম্বল সারা গায়ে জড়িয়ে আগুন পোহাবার জন্য শুকনো পাতা কুড়োতে বনের ভেতর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে চলেছে।

শীতের সকালের ভাবধারা :
পূর্ব দিগন্তে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে থাকে। উত্তর দিক থেকে হিমশীতল ঠান্ডা বাতাস এক দীর্ঘশ্বাসের মতো বইতে থাকে। গাছপালার পাতার ফাঁক দিয়ে বয়ে যায়। পাতাগুলো হালকা কেঁপে ওঠে। টুপটাপ করে শিশির ঝরে পড়ে। দূরে কোথাও গৃহস্থের হাঁস-মুরগির ডাক শোনা যায়। গ্রামবাংলার পথে কিষাণের দল মাঠের দিকে যাচ্ছে। গরু, মহিষ, ছাগল, হাঁস ইত্যাদি বনের জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। সবকিছু মিলিয়ে এক চিরচেনা গ্রামীণ সকাল। শীতের সকালের এই ভাবধারা মানুষকে আপন করে নেয়।

শীতের সকালের বৈরাগ্য মূর্তি :
শীতের সকাল যেন এক ধ্যানী সন্ন্যাসী। তার শান্ত মুখমণ্ডল ধূসর কুয়াশার আবরণে ঢাকা। সূর্য ধীরে ধীরে উঠে তার মুখে আলো ছড়িয়ে দেয়। সে নির্লিপ্ত, নির্বিকার। চারদিকে জীবন থাকলেও সে নির্বাক।

শহরের শীতের সকাল :
শহরের শীতের সকাল একেবারেই ভিন্ন। এখানে কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা সবকিছু মিলেমিশে থাকে। কিন্তু শীতের সকালের কোমলতা শহরেও এক অন্যরকম অনুভূতি এনে দেয়। বেবী, টেম্পু, রিকশার শব্দ মিশে থাকে। শহরের ইট-কাঠ-পাথরের কৃত্রিম কাঠিন্যের মধ্যে গ্রামবাংলার উদাস করা শীতের সকালের ধ্যানসমাধির মিষ্টি মধুর রূপটি খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে নেই কুয়াশার দীঘল বিস্তৃত জৌলুস। তবুও কুয়াশার বুক চিরে যখন ভোরের বাস কিংবা ট্রামটি দুলতে দুলতে চলে তখন তাকে বেশ উদাস মনে হয়, মনে হয় ঘুম রয়ে গেছে তার চোখে।

উপসংহার :
ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশে শীতের সকাল তার নিজস্ব রূপ মাধুর্যে অনবদ্য প্রসার সাজিয়ে বাংলার গ্রাম-শহরে অবস্থান নেয়; যা অন্য ঋতুর সকালের তুলনায় স্বতন্ত্র ও অনন্য।

শীতের সকাল রচনা – এসএসসি, এইচএসসি

সংকেত : ভূমিকা, শীতের সকালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গ্রামে শীতের সকাল, শহরে শীতের সকাল, শীতের সকালে নদ-নদী, শীতের সকালের প্রধান আকর্ষণ, শীতের সকালের সুখ-দুঃখ, শীতের সকালের অসুবিধা, যানবাহন চলাচলের অসুবিধা, উপসংহার।

ভূমিকা : শীতের সকালে লেপের তলা থেকে উঠি উঠি করেও উঠতে ইচ্ছে করে না; শিশিরে সিক্ত শীত কনকনে কাঁপাতে কাঁপাতে যেন বলে—আরো কিছুক্ষণ থাকো। গরম বিছানার স্ব-রচিত উষ্ণতা ছেড়ে উঠতে গেলেই কেমন এক দুর্বিষহ আলস্য সমস্ত চেতনাকে ঘিরে ধরে। তন্দ্রা-বিজড়িত চেতনার দূর বনাঞ্চল থেকে পাখিদের কল-কূজন শোনা যায়। অথচ চারদিকের পৃথিবী এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতায় মগ্ন। তারই মধ্যে যেন শীতের বুড়ি কুয়াশার কম্বল সারা গায়ে জড়িয়ে আগুন পোহাবার জন্য শুকনো পাতা কুড়োতে বের হয়। কাঁপতে কাঁপতে চলতে থাকে।

শীতের সকালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য : উত্তরের হিমেল হাওয়া বয়, গাছপালা পাতাহীন হয়ে পড়ে। শীতের সকালে যখন ঘন কুয়াশা সবকিছু ঢেকে যায় তখন প্রকৃতিকে অপূর্ব সুন্দর মনে হয়। পাথুরে প্রকৃতির মধ্যেও এক নীরব সৌন্দর্য দেখা যায় শীতের সকালে। শীতের সকালের সৌন্দর্য অনেকটাই বিমূর্ত। শীতের সকালে প্রকৃতি আশ্চর্য নিস্তব্ধতায় মগ্ন হয়ে পড়ে। কুয়াশার অবগুণ্ঠন ছিঁড়ে নিস্তব্ধতার বুক চিরে কোনো পাখি হেঁটে গেলে মনে হয় শীতের কনকনে ঠান্ডায় তার শরীর কাঁপছে। টিনের চালে, গাছের ডালে, ঘাসের ডগায়, শিশির বিন্দু জমে থাকার মনোরম দৃশ্য শীতের সকাল ছাড়া আর দেখা যায় না। ঘন সাদা চাদর মুড়ে থাকা প্রকৃতির বুকে মুক্তার মতো ঝুলে থাকা শিশির বিন্দুগুলো চিকচিক করে। প্রকৃতি হয়ে ওঠে সতেজ। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয় হৃৎ সরোবর খেত আর ফুলের বাগান। কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্য যখন উঁকি দেয় তখন স্নিগ্ধ আলোর বালাম করে শিশির ভেজা প্রকৃতি।

গ্রামে শীতের সকাল : প্রকৃত অর্থে শীতের সকালের তাৎপর্য গ্রামেই, গ্রামেই শীতের সকাল উপভোগ্য। গ্রামীণ প্রকৃতিতেই শীতের সকাল একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কৃষক চলে মাঠের পথে। গরুর গাড়ি চলে ঘাটের পথে। দরিদ্র পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরা বস্তাবন্দী ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে আর একটু সূর্যের উষ্ণতার জন্য তাদের শীতার্ত দৃষ্টিতে থাকে অধীর প্রতীক্ষা। বস্ত্রহীন গরিব মানুষের শীতের সকাল কাটে আগুনের কুণ্ড ঘিরে। প্রায় বাড়িতেই খড়কুটা দিয়ে আগুনের কুণ্ড তৈরি করে গ্রামের মানুষ তার চারদিকে বসে আগুনের উষ্ণতা উপভোগ করে। তারা তখন গল্পগুজবে মশগুল হয়। পল্লিগ্রামে শীতের সকাল আরো বেশি উপভোগ্য হয়ে ওঠে শীতের পিঠে খাওয়ার মাধ্যমে। বাড়িতে বাড়িতে খেজুরের রস জ্বাল দেওয়ার মৌ মৌ মিষ্টি গন্ধ হিমেল বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। তবে গ্রামের অবস্থাপন্ন বাড়ির পৃথক চিত্র দেখা যায় শীত-সকালে। লেপ-কম্বলের উষ্ণ আবেশে বিছানায় বিলাসী ঘুম শীত-সকালে একটু বিলম্বেই ভাঙে। গঙ্গার ঘাটে নৌকার পাটাতনে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে হাঁড়ি-পাতিল-ভেজা শিশির-সিক্ত হয়ে।

শহরে শীতের সকাল : শহরে শীতের সকালটা একটু ভিন্ন আঙ্গিকেই কাটে। শীতের সকালে শহরবাসীর ঘুম বিভিন্ন পাখির কলরবে না ভাঙলেও, ভাঙে কারখানার ডাকে। শীতের সকালটা শহরবাসীর ঘুমের মধ্যেই কাটিয়ে দেয়। শীতের সকালে তাদের লেপের উষ্ণতা ছেড়ে কাজে ফিরতে ইচ্ছে করে না। যাদের সকালে উঠতেই হয় তারাও ছুটির দিনে বেশ দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। তাই শহরের লোকেরা গ্রামের মানুষের মতো শীতের সকালকে উপভোগ করে তুলতে পারে না। আর শহরে পিচ ঢালা রাস্তা কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে, শিশিরে পড়ে তবে গ্রামের মতো শিশির ভেজা ঘাসের ছোঁয়ায় পথিকের মন আন্দোলিত হয় না।

কনকনে ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুতে ইচ্ছে করে না বয়স্কদেরও, ছোটরাও তো ঠান্ডা পানিতে ভয়ে পালাই পালাই করে। শহরের মানুষদের সৌন্দর্য দেখা, সূর্যোদয় দেখা, শীতের সকালের কুয়াশা দেখার মন-মানসিকতা নেই। যান্ত্রিক জীবনে যারা অভ্যস্ত তাদের কাছে এসব হলো আবেগের ব্যাপার। তবে শহরের লোকেরা রংবেরঙের শীতের কাপড়ের মাধ্যমে শীতের সকালকে রাঙায় করে। কোট, জ্যাকেট, সোয়েটার, টুপি, চাদর, মাফলর প্রভৃতি আরামদায়ক পোশাক জড়িয়ে শীতের সকালে নিজ নিজ কর্মস্থলে বেরিয়ে পড়ে।

শীতের সকালে নদ-নদী : আমাদের দেশে শীতকালে নদ-নদীগুলোতে তেমন পানি থাকে না। তখন নদী থেকে প্রচুর মাছ ধরা যায়। এজন্য শীতের খুব সকালে জেলেরা মাছ ধরতে নদীতে চলে যায়। জেলে নৌকাগুলো অল্প দূরে হলেও কুয়াশার ঘনত্বে দেখা যায় না। আর সেই কুয়াশা ভেদ করে দুরূহভাবে নৌকা, লঞ্চ, ফেরি ইত্যাদি ভালোভাবে চলাচল করতে পারে না। তখন নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাসে হাড় কাঁপানো শীত লাগে।

শীতের সকালের প্রধান আকর্ষণ : শীতের সকালের প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন রকম পিঠা। তখন গ্রামে প্রচুর খেজুরের রস পাওয়া যায়। খুব সকালে খেজুর গাছ থেকে হাঁড়ি নামানো হয়। শীতের সকালে এ রস খেতে খুবই ভালো লাগে। সকাল হতে না হতেই গ্রামজুড়ে সর্বত্র খেজুর রসের পায়েস খাওয়ার ধুম পড়ে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে রোদ পোহাতে পোহাতে মুড়ি-মুড়কি, পিঠা-পায়েস এসব খেতে পছন্দ করে। এ সময়ের প্রধান আকর্ষণ হলো চিতই পিঠা ও ভাপা পিঠা। এছাড়া হরেক রকম পিঠা ঘরে ঘরে বানানো হয়। তাই তো কবি সুফিয়া কামাল বলেছেন-

পৌষ-পার্বণে পিঠা খেতে বসে ক্ষুধিতে বিষম খেয়ে
আরও উল্লাস বাড়িয়েছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।

শীতের সকালের সুখ-দুঃখ : শীতের সকালে লেপ-কম্বলের ভেতরে আরামে শুয়ে থাকার মতো সুখ আর কিছুতে পাওয়া যায় না। শীতের সকালে বিভিন্ন পিঠা দিয়ে নাশতা করা, নানা রকম শীতের সবজি প্রকৃতি মানুষের মধ্যে সুখানুভূতি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, কনকনে শীতে যাদের গায়ে দেওয়ার মতো শীতবস্ত্র নেই, যারা রাস্তায় পাশে শীতের হিমশীতল বাতাসে ঘুরে থাকে তাদের জন্য শীতের সকাল অনেক কষ্টের।

শীতের সকালের অসুবিধা : শীতের সকালে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পড়লে গ্রামের মানুষ জড়তা ও বিশৃঙ্খলায় ভোগে। মানুষের কাজের উদ্যম কমে যায়। আরাম-আয়েশ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। গরিব মানুষেরা গরম কাপড়ের অভাবে কষ্ট করে।

কবি ভাষায় তাদের মনে প্রার্থনা জাগে-
হে সূর্য!
তুমি আমাদের সান্ত্বনাতে ভিজে ঘরে
উষ্ণতা আর আলো দিও।

যানবাহন চলাচলের অসুবিধা : শীতের সকালে পরিবেশ কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে। ফলে দূর থেকে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। মনে হয় কুয়াশার সাদা পর্দা ছাড়া সামনে কিছু নেই। এ সময় রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচলের ফলে দুর্ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি। নদীপথে লঞ্চ-স্টিমার চলাচলের ক্ষেত্রেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থায় রাস্তায় বা নৌপথে চলাচল না করাই ভালো।

উপসংহার : শীতের সকালে শিশির ভেজা সোনালি রোদের স্পর্শ কার না ভালো লাগে? সুবিধা-অসুবিধা দুয়ে মিলে শীতের সকাল আমাদের জীবনে প্রতি বছর দুই মাস সময় অনাবিল ভালোবাসার অনুভূতিতে আমাদের হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে তোলে। কবির ভাষায় বলা যায়-

‘একটি ধানের শীষের ওপর একটি শিশির বিন্দু’ শীতের সকালের সৌন্দর্যকে দুগুণ করে তোলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top